প্রায় চারটা বাজে। মাত্র ল্যাব থেকে বেরুলো কুহু।ক’দিন আগের তুষারপাতের শেষচিহ্ন হিসেবে বরফকাদা ইতিউতি পড়ে আছে গলে যাবার অপেক্ষায়।সাবধানে পা ফেলে হেঁটে বাড়ী ফিরছে তাই। হঠাৎ মেঘের চাদর সরিয়ে রোদ এসে আলো করে দিল চারিদিক। “বাহ্, রোদ, তোমার দেখা মিললো অবশেষে!” তার মানে হয়তো আর ক’দিন পর সত্যি সত্যি বসন্ত। ভাবতেই মনের ভেতর এক চিলতে খুশী ঝিলিক দিয়ে গেল ওর।
রুমে এসে ব্যাকপ্যাক নামাতে নামাতে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো কুহু।সামনের ছোট পার্কের গাছগুলোর ন্যাড়া ডালগুলোতে খেলে বেড়াচ্ছে কাঠবেড়ালী, একটা ডালে পাখিও দেখা গেলো মনে হলো অনেকদিন পর। মুহুর্তে কী হলো কে জানে, তাড়াহুড়ো করে কাপড় বদলিয়ে, পায়ে হাঁটার জুতো আর গায়ে জ্যাকেট গলিয়ে দিয়ে দিল ছুট। ছোট পার্কটা পেরিয়ে রাস্তা পার হয়ে রিভারসাইড পার্কে ঢুকে পরলো, বিকেলের ব্যায়ামবাহিনী সক্রিয় তখন। পার্কের এমাথা থেকে যতদূর পর্যন্ত আরেকদিকে দেখা যায়, রোদ গায়ে মেখে লোকজন জগিং, নয় তো সাইকেল চালাচ্ছে – বাচ্চারাও হয় দৌড়ঝাপ, না হলে বাবা-মার সাথে পাশাপাশি সাইকেলে আছে। কিছু বুড়ো-বুড়ি বেঞ্চে বসে বই পড়ছে। অনেকটা স্বাভাবিক বসন্তের বিকেল।
হাঁটতে শুরু করলো কুহু। ওর অভ্যেস হচ্ছে ক্রমশ উপর থেকে নিচেরদিকের সড়ক নম্বর ধরে এগোনো। তারপর দু’বার এমাথা-ওমাথা করে প্রায় পাঁচ মাইলের মতো হেঁটে কিছুক্ষণ স্ট্রেচ করে বাড়ী ফেরা। আজকেও তাই ইচ্ছে। উপরের পাথুরে রাস্তা ঢাল বেয়ে নেমে যাচ্ছে নিচের মসৃণ রাস্তাতে। এটাই প্রধান পথ, একসঙ্গে এরকম সরু কতকগুলো ঢাল নেমে এসে রাস্তাটাতে মিশে গেছে। কুহু হাঁটতে শুরু করলো, এখন একটু জোরেই। পাশ দিয়ে ট্রাইসাইকেলে একটা ফুটফুটে মেয়ে খিলখিল হাসতে হাসতে পার হয়ে গেল, পাশে বাবা দৌড়াচ্ছে। আরেকটু দূরে ফুটবল নিয়ে দু’টো কিশোর একজন আরেকজনকে ছুড়ছে আর লুফছে। এবার একটু একটু করে ঘামছে কুহু, পাশের হাডসন নদী থেকে হাল্কা ঠান্ডা বাতাস আশার পরও। সাধারণত অন্যদিন আইপডও থাকে কানে লাগানো, আজকে স্নিগ্ধ রোদ্দু্র বিকেল দেখে হয়তো আর খেয়াল ছিল না। খুব একটা যে মিস করছে তা না, কিন্তু কি জানি নেই মনে হচ্ছে খালি।
আন্দাজে মনে হলো প্রায় এক মাইল হয়ে গেছে পেরোনো কুহুর। ডানে বার্জ যাচ্ছিল, হর্ণের শব্দে হাঁটা কিছুক্ষণের জন্য থামিয়ে বার্জটার চলে যাওয়া দেখছিল। হঠাৎ পেছন থেকে নাম ধরে ডাক। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো একটা ছোট দেবশিশু ওর দিকেই আসছে। আরে, এ তো হেনরি! কেইটির দেড় বছরের ছেলে, নিয়মিত স্কুলে মায়ের সাথে আসে, অনেক সময় ক্লাসেও ঘুমিয়ে থাকে স্ট্রলারে। কেইটি সেই স্ট্রলার ঠেলে এগিয়ে হেসে জড়িয়ে ধরলো কুহুকে। হেনরি ততোক্ষণে কুহুর কোলে উঠে গেছে।
”হেই, ওয়াটস আপ? হাঁটতে বেড়িয়েছো?” হেনরির সিপিকাপ বের করতে কেইটি তখন ব্যস্ত।
”হ্যাঁ”, কুহুর উত্তর, ”দেখ না কি সুন্দর রোদ উঠেছে আজকে। আশা করি, আর তুষারঝড় দেখতে হবে না আমাদের।”
“ইয়া, হোপফুলি”।
কুহু তখন হেনরিকে দু’পায়ের মধ্যে আটকিয়ে ওকে বীব পড়াচ্ছে। আর মা ছেলেকে পানি খাওয়াতে ব্যস্ত, একটু জোরও করতে হলো কেননা সামনের গাছটাতে আচমকা দৌড়ে এসে তড়াক করে একটা কাঠবেড়ালি উঠে যাচ্ছে, হেনরি তখন একছুটে গাছটার কাছে চলে যায় পারলে। কেইটি সেটা দিলো না দেখে ভ্যা করে কেঁদে দিলো ছেলেটা। কুহুর দেখে ভারী মায়াই হলো, তাড়াতাড়ি কোলে তুলে নিয়ে হেনরিকে ঠান্ডা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। পেছন থেকে কেইটি বললো এগিয়ে যেতে, ও তখন ব্যাগে সব ঢুকাতে স্ট্রলার নিয়ে যুদ্ধ করছে ।
কেইটি খানিক্ষণ পর কুহুর পাশে চলে এসেছে। ”তো সামারে কি করছো?”
হেনরির মুখ থেকে কুহুর দৃষ্টি চলে যায় কেইটির মুখের উপর।
“সেমিস্টার শেষ হলে দেশে চলে যাব। জানোই তো, আমার এখনো হোম রেসিডেন্সি ব্যান আছে এক বছর, কাজ করতে পারবো না।” কুহু হেনরির হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে খেলছে।
”ওহ্, কোনো মানে হয়? তুমি এখানে জব পেয়ে যাবে, আরেকটু যদি অপেক্ষা করো। জব মার্কেট এখন আস্তে আস্তে ভালোর দিকে।” কেইটি তখন কুহুকে পাশ দিয়ে জড়িয়ে ধরে হাঁটছে।
কুহু কিছু বললো না, খালি মুচকি হাসল।
“তোমার কি প্ল্যান, কেইটি?” সাইকেলের বেলে ডানে তাকালো কুহু, সুর্য্যের তেজ এখন বেশ স্তিমিত, হাল্কা সোনালী আভায় ছেয়ে আছে পুরো পার্ক। নদীটা যেন সোনালি তবকে মুড়ে।
“ওয়েল, আমি নিউ হ্যাম্পশায়ারে চলে যাচ্ছি। ওখানে আমাদের স্কুল বোর্ডের ইলেকশনে আমি স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে দাঁড়াচ্ছি। এতোদিন তো শুধু পড়ালাম, এবার পলিসি মেকিঙ-এ না হয় নামি!”
কুহু আসলে অবাক না মুগ্ধ, বুঝে উঠতে পারলো না। দাঁড়িয়ে গেলো অজান্তেই। কেইটি কুহুর হাত থেকে হেনরিকে নিয়ে স্ট্রলারে বসাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। কুহু এখন রীতিমতো হাত কোমরে দিয়ে দাঁড়িয়ে।
কেইটি তখন ফেরার পথে। কুহুর আর পাঁচ মাইল হাঁটা হলো না। মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনে গেল কেইটির বাবার কথা, যিনি ওদের স্কুলবোর্ডের প্রেসিডেন্ট ছিলেন প্রায় নয় বছর, তারও আগে বিভিন্ন টার্মে ওর স্কুলের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছেন বোর্ডে বহু্বার। স্কুলের সামান্য শিক্ষক হিসেবে শুরু করা ক্যারিয়ার আজ বিশাল সাফল্যমন্ডিত। এখন ওর বাবাকে দেখে কেইটি নিজে ওর ছোটবেলার স্কুলে অবদান রাখতে চায়। ওর স্বামী, টাইলার, নিজেও স্থানীয় ইলেকশনে দাঁড়াতে যাচ্ছে সামনের বছর।
ঢাল ধরে হেঁটে উঠে যাওয়ার আগে কুহু আরেকবার কেইটির মুখের দিকে তাকায়। কেইটি তখন এক হাতে স্ট্রলার আর আরেক হাত রীতিমতো নাড়িয়ে ইলেকশন প্রক্রিয়া বোঝাচ্ছে। কেইটির আঙ্গুলগুলো যেন পড়ন্ত বিকেলের রোদে স্বপ্ন বুনে চলেছে আপন মনে।
রাস্তার পাশে পার্ক করা গাড়িতে হেনরিকে বসিয়ে, স্ট্রলার গুটিয়ে, কেইটি যাওয়ার আগে আরেকবার জড়িয়ে ধরলো কুহুকে। টাইলার আগে এসে গাড়িতে বসেছিল, বের হয়ে এসে হেনরিকে কার সীটে বসাতে ব্যস্ত। ও-ও এসে কুহুকে বিদায় জানিয়ে গাড়িতে উঠে বসলো। কেইটি বারবার প্রতিঞ্জা করালো কুহুকে যাওয়ার আগে নিউ হ্যাম্পশায়ারে এসে এক সপ্তাহ থেকে যাওয়ার জন্য, গাড়ির ভেতর থেকে টাইলারও বলে উঠলো সেইলিং-এ যাবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে।
কেইটিরা চলে গেল।
ফিরতি পথে হাডসন নদীটা এবার বাঁদিকে কুহুর। উল্টোদিকে খেয়াল করলে উঁচু গাছগুলোর ফাঁক দিয়ে নিউ জার্সি দেখা যায়। গোধূলী চলছে। গাছগুলোর ফাঁক দিয়ে গলে আসা মিষ্টি রোদ যেন পাথুরে রাস্তায় কালো-সোনালীর আলপনা এঁকে যাচ্ছে বিরামহীন।
রাস্তায় এখন গাড়িরও শব্দ।
কুহুর হঠাৎ করে ঢাকার কথা মনে হলো। বাবার কথাও। সেই তখন থেকে, যখন কেইটি ওর নিজের বাবার কথা বলছিল। উত্তরাধিকার। পরম্পরা। ঐতিহ্য। ভাল, নামী স্কুলে পড়ে এখন ও নিজের শিকড়ে ফিরে যাচ্ছে কিছু দেওয়ার, করার ইচ্ছে থেকে। এই ট্রেন্ডটা ওবামা থেকে আরও গেঁথে বসেছে। বিকেলের স্নিগ্ধ আভায় ওর হাস্যোজ্জ্বল মুখে যেন সেই স্বপ্ন এসে খেলছিল।
কুহুর তখনও বাবার কথাই মনে হতে থাকে হেঁটে যেতে যেতে। মুক্তিযোদ্ধা বাবা। একসময়ের সরকারী চাকুরে। মায়ের হিসেবের সংসার। ছোট ভাই। নিজেদের বড় হয়ে যাওয়া, যেন না বলেই সময়কে, কিম্বা সময়ই হয়তো বলে বোঝাতে পারেনি। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের চিৎকার-চেঁচামেচি, খেলাধূলা, দিনভর আড্ডা, স্টাডি ট্যুর। পাশের আগেই ভাগ্যক্রমে চাকুরি। বাইরে পড়তে আসা। এসে আরও বড়ও স্বপ্ন দেখা।
কিন্তু এখানে রাজনীতি কোথায়? কুহুর রক্তে তো রাজনীতি মিশে আছে! দেশ যখন উত্তাল জোয়ারে ভাসছে স্বাধীনতার ডাকে, তখন ওরই পূর্বপুরুষ নিজ এলাকার প্রতিনিধি জাতীয় পরিষদে। বাবার নিজের হাতে তৈরী করা পোস্টার, দাদী আর ফুপুদের বাড়ী বাড়ী যেয়ে ক্যানভাসিং, বাবার বন্ধুবান্ধবদের শুধু চা খাইয়ে পিকেটিং-এ কাজে লাগানো, খুব বেশীদিন আগের কথা কী! অথচ, কুহুর নিজের স্বপ্নে রাজনীতির কোনো স্থান নেই। মাত্র দু’প্রজন্মেই এত স্বপ্নবদল?
গোধূলী তখন পেরিয়ে প্রায় সন্ধ্যে ছুঁই ছুঁই। রাস্তার দু’পাশে উঁচু সুরম্য অট্টালিকা। সূর্য্যের শেষ আভাটুকু আর দেখা হয়না তাই। কুহুর নিজের স্বপ্নে যেমন স্বার্থপরতা এসে অজান্তেই জুড়ে থাকে, সোনালী আভার ডানা যেন সেভাবেই মাথা কুটে মরে যায় এই ধূসর গহীন জঙ্গলে।।
- শরতশিশির -
humaira.chowdhury@gmail.com








এ্যাডাইলাম ।
ধন্যবাদ।